মহাভারতের চরিতাবলী পর্ব ১

মহাভারতের চরিতাবলী পর্ব ১

This entry is part 1 of 1 in the series মহাভারতের চরিতাবলী

অক্রূর

কৃষ্ণের সখা, সম্পর্কে পিতৃব্য।

অক্ষয়পাত্র

পঞ্চপাণ্ডবদের বনবাস যাত্রার সময়ে সূর্যদেব যুধিষ্ঠিরকে এই পাত্র দিয়ে বলেছিলেন যে, পাঞ্চালী (দ্রৌপদী) এই পাত্রে ফল মূল আমিষ শাকাদি রন্ধন করে যতক্ষণ অনাহারে থাকবেন ততক্ষণ চতুর্বিধ অন্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

অগস্ত্য

বিখ্যাত মুনি। পাণ্ডবরা যখন তীর্থে গিয়েছিলেন তখন এঁর জীবন-কাহিনী ওঁরা শোনেন। ওঁর স্ত্রী লোপমুদ্রা ছিলেন বিদর্ভরাজের কন্যা। উনিও একজন তপস্বিনী ছিলেন। ওঁদের পুত্রের নাম দৃঢ়স্যু। অগস্ত্যমুনি একবার তাঁর পত্নী লোপামুদ্রার ইচ্ছাপূরণের জন্য রাক্ষস ইল্বলের কাছে ধন চাইতে এসেছিলেন, তখন ওঁর চোখের সম্মুখে ইল্বলের ভ্রাতা বাতাপি একটি মেষ হয়ে গেলেন। ইল্বল সেই মেষটি কেটে রন্ধন করে অতিথিদের দিতে, অগস্ত্য বললেন আমিই একে খাব। এর আগে বহুবার ইল্বল এইভাবে তাঁর মেষরূপী ভ্রাতাকে কেটে ব্রাহ্মণদের খাইয়ে, উদরস্থ ভ্রাতাকে পুনর্জীবিত করে ব্রাহ্মণদের অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন। এবারও তাই ঘটবে তিনি ভেবেছিলেন। কিন্তু অগস্ত্যের খাওয়া শেষ হলে ইল্বল যখন বাতাপিকে ডাকলেন, তখন অগস্ত্য বললেন যে, বাতাপি আসবে না, কারণ তিনি তাঁকে জীর্ণ করে ফেলেছেন।

কালেয় দানবরা যখন রাত্রিকালে সমুদ্র থেকে বেরিয়ে তপস্বী ব্রাহ্মণদের বধ করছিলেন তখন দেবতাদের অনুরোধে অগস্ত্য মহাসমুদ্র পান করেন। ফলে কালেয়দের আর আত্মগোপন করার স্থান রইলো না – দেবতাদের হাতে নিহত হলেন। দানবরা বিনষ্ট হবার পর দেবতারা যখন অগস্ত্যকে বললেন উদর থেকে জলরাশি উদ্গার করে সমুদ্রকে আবার পূর্ণ করতে, তিনি বললেন, সব জল জীর্ণ হয়ে গেছে। পরে ব্রহ্মা ভগীরথকে দিয়ে সমুদ্র আবার জলপূর্ণ করেন।

দানবরা একবার দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করলে দেবতারা অগস্ত্যের শরণাপন্ন হন। অগস্ত্য সেই শুনে ক্রোধে প্রজ্বলিত হলে, দানবরা দগ্ধ হয়ে প্রাণশূন্য হয়ে অন্তরীক্ষ থেকে নিপাতিত হতে লাগলেন। শুধু যাঁরা মর্ত্যে আর পাতালে ছিলেন – তাঁরাই রক্ষা পেলেন। স্বর্গস্থ দানবরা সব বিনষ্ট হলে দেবতারা অগস্ত্যকে অনুরোধ করলেন, মর্ত্য ও পাতালের দানবদেরও বিনষ্ট করতে। অগস্ত্য রাজি হলেন না। দেবতাদের বললেন যে ওঁদের অনুরোধ রক্ষা করতে উনি স্বর্গের দানবদের ধবংস করেছেন, কিন্তু এখন অন্য অনুরোধ রক্ষা করতে হলে ওঁর নিজের তপোবল ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।

একবার বিন্ধ্যপর্বত মেরুপর্বতের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে বাড়তে শুরু করেছিলেন যাতে মেরু-প্রদক্ষিণকারী চন্দ্রসূর্যের পথরোধ হয়। দেবতারা অগস্ত্যের শরণ নিলে অগস্ত্য বিন্ধ্যের কাছে গিয়ে বললেন যে, তিনি দক্ষিণে যাবেন – বিন্ধ্য যেন ওঁর পথ করে দেন। আর অগস্ত্য না ফেরা পর্যন্ত বিন্ধ্য যেন আর বর্ধিত না হন। বিন্ধ্য অগস্ত্যকে ভক্তি করতেন বলে তাতে স্বীকৃত হলেন। অগস্ত্য দক্ষিণ দিকে চলে গেলেন, কিন্তু আর ফিরলেন না। বিন্ধ্যপর্বতও আর বাড়তে পারলেন না।

অগ্নি

আগুনের দেবতা যিনি মহর্ষি ভৃগুর অভিশাপে সর্বভুক হয়েছিলেন। (একবার সংকটে পড়ে অগ্নি পুলোমা নামে এক রাক্ষসকে ভৃগুর বিবাহিত স্ত্রী পুলোমাকে হরণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন – তাই ভৃগু অগ্নিদেবকে এই অভিশাপ দেন)।

অগ্নিবেশ

অগ্নি-সম্ভূত ঋষি। ইনি ভরদ্বাজের শিষ্য ছিলেন। ভরদ্বাজ প্রদত্ত একটি আগ্নেয়াস্ত্র ইনি গুরুপুত্র দ্রোণকে দান করেন।

অগ্নিহোত্র

অগ্নিদেবের পূজা বা অঞ্জলি।

অচ্যুত

কৃষ্ণের একটি নাম।

অঙ্গ

ম্লেচ্ছদের রাজা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষ নিয়েছিলেন।

অঙ্গদেশ

বর্তমান মুঙ্গের ও ভাগলপুর জেলায়।

অঙ্গারপর্ণ

গন্ধর্বরাজ – যাঁর অপর নাম ছিল চিত্ররথ। সোমাশ্রয়ণ তীর্থে গঙ্গাতীরে অঙ্গারপর্ণ যখন তাঁর ভার্যা কুম্ভীনসী ও অন্যান্য স্ত্রীদের নিয়ে জলক্রীড়া করতে এসেছিলেন, তখন পাণ্ডবদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পাণ্ডবরা বারণাবতে জতুগৃহদাহের পর নানান জায়গা ঘুরে তখন পাঞ্চাল দেশের দিকে যাচ্ছিলেন। অঙ্গারপর্ণ পাণ্ডবদের স্থানত্যাগ করতে বললে, অর্জুন সম্মত হন না। তখন অর্জুনের সঙ্গে অঙ্গারপর্ণের যুদ্ধ হয়। অর্জুন দ্রোণ প্রদত্ত এক আগ্নেয় অস্ত্র নিক্ষেপ করতে অঙ্গারপর্ণের রথ দগ্ধ হয় এবং অঙ্গারপর্ণ হতচেতন হয়ে পড়ে যান। পরাজিত অঙ্গারপর্ণ পরে চেতনা ফিরে পেয়ে অর্জুনকে তাঁর চাক্ষুষী বিদ্যা (ত্রিলোকের যা কিছু এই বিদ্যাবলে দেখতে পাওয়া যায়) দান করেন। এই অঙ্গারপর্ণের পরামর্শেই পাণ্ডবরা দেবল ঋষির কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধৌম্যকে কুল-পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত করেন।

অঙ্গিরা

ব্রহ্মার মানসপুত্র ও সপ্তর্ষিদের অন্যতম। অঙ্গিরার পুত্ররা হলেন – বৃহস্পতি, উতথ্য, পয়স্য, শান্তি, ঘোর, বিরূপ, সংবর্ত ও সুধন্বা।

অজাতশত্রু

মহাভারতে যুধিষ্ঠিরকে অজাতশত্রু বলা হয়। অজাতশত্রুর অর্থ হল যাঁর কোনও শত্রু জন্মায় নি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে কৌরবরা কি তাহলে যুথিষ্ঠিরের সঙ্গে শত্রুতা করে নি! করে থাকলে উনি অজাতশত্রু হন কি করে?

অজৈকপাদ

দেবতা। একাদশ রুদ্রের এক রুদ্র।

অতিরথ

সর্বোচ্চ শ্রেণীর যোদ্ধা। রণনৈপুণ্য অনুসারে যোদ্ধাদের শ্রেণী বিভাগ হল – রথি, মহারথ, অতিরথ।

অত্রি (১)

ব্রহ্মার মানসপুত্র ও সপ্তর্ষিদের অন্যতম।

অত্রি (২)

অসুরদের গুরু শুক্রের পুত্র ইনি ভার্যার অনুরোধে বনবাসে যাবার আগে রাজর্ষি বেণের কাছে গিয়ে পুত্র ও ভৃত্যদের দিয়ে যাবার জন্য ধন সংগ্রহ করে এনেছিলেন।

অদিতি

দক্ষের কন্যা ও কশ্যপের স্ত্রী। অদিতির বারোটি পুত্র – বিবস্বান, অর্যম্‌ , পূষা, ত্বষ্টা, সবিতা, ভগ, দাতা, বিধাতা শত্রু (ইন্দ্র), বরুণ, মিত্র ও উরুক্রম। এঁরা আদিত্য বলে পরিচিত।

অদ্রিকা

অপ্সরা। অদ্রিকা যখন শাপুগ্রস্থা হয়ে মৎসরূপে নদীতে বিচরণ করছিলেন, তখন দৈবচক্রে বসুরাজের স্খলিত শুক্র পান করে তিনি গর্ভবতী হন। এক মৎসজীবির হাতে ধরা পড়ে অদ্রিকা গর্ভধান করেন এবং মুক্তি পেয়ে স্বর্গে ফিরে যান। প্রসঙ্গত মৎসজীবি পালিতা অদ্রিকার এই কন্যা সত্যবতীই পঞ্চপাণ্ডব ও দুর্যোধন-ভ্রাতাদের প্রপিতামহী।

অধর

পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের (যজ্ঞসেন) পুত্র।

অধর্ম

ক্ষুধার্ত মানুষের খেয়োখেয়ি থেকে অধর্ম্মের জন্ম। অধর্ম্মের স্ত্রীর নাম নৈর্ঋতি। নৈর্ঋতি ভয়, মহাভয় ও মৃত্যু – এই তিন রাক্ষসের জন্ম দেন, যার থেকে রাক্ষসকুলের শুরু। সেইজন্যে রক্ষসদের অনেক সময় নৈর্ঋত বলা হয়।

অধিরথ

বসুষেণের (কর্ণ) পালক-পিতা। সূতবংশীয় (তন্তুবায় – যাঁরা প্রাচীন ভারতে তাঁত বুনে জীবিকা পালন করতেন) অধিরথ ও তাঁর স্ত্রী রাধা কুন্তীর পরিত্যক্ত কানীন (কুমারী অবস্থায় জাত) পুত্র কর্ণকে জল থেকে উদ্ধার করে পরম স্নেহে বড় করেন। কর্ণ নিজের আসল পরিচয় জানার পরেও নিজেকে সূতপুত্র বা রাধেয় বলে পরিচয় দিতেন।

অনন্তনাগ

কশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী কদ্রুর জ্যেষ্ঠ নাগ-পুত্র (অনন্তনাগ, শেষনাগ ও বাসুকি – তিন নামেই ইনি পরিচিত)। মাতা কদ্রুর অন্যায় আদেশ অমান্য করায় কদ্রু অনন্তকে শাপ দেন যে, তিনি জনমেজয়ের সর্প-যজ্ঞে দগ্ধ হয়ে মারা যাবেন। নানা পবিত্র তীর্থে কঠোর তপস্যার পর অনন্তনাগ ব্রহ্মার দেখা পান। ব্রহ্মা ওঁকে বলেন, বন-সাগর-জনপদাদি-সমন্বিত চঞ্চল পৃথিবীকে নিশ্চল করে ধারণ করতে। অনন্ত (শেষ) নাগ পাতালে গিয়ে মাথার ওপর পৃথিবী ধারণ করলেন। ব্রহ্মার অশীর্বাদে গরুড় তাঁর সহায় হলেন এবং পাতালের নাগগণ তাঁকে নাগরাজ বাসুকিরূপে বরণ করলেন।

অনবদ্যা

কশ্যপ ও প্রধার কন্যা।

অনল

অষ্টবসু দেবতার একজন। প্রজাপতি ও তাঁর স্ত্রী শাণ্ডিল্যার পুত্র।

অনসূয়া

মহর্ষি অত্রির পত্নী। অনসূয়া অত্রিকে পরিত্যাগ করে (কার্তিক সম্পর্কীত আলোচনা দেখুন) মহাদেবের শরণাপন্ন হয়ে তিনশো বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে অনসূয়াকে বর দিয়েছিলেন যে, স্বামী সহবাস ছাড়াই অনসূয়ার পুত্র হবে এবং ঐ পুত্র অনসূয়াকে গৌরবান্বিত করবে।

অনিল

অষ্টবসু দেবতার একজন। প্রজাপতি ও তাঁর স্ত্রী শ্বাসার পুত্র।

অনু

ভরত বংশের রাজা যযাতি ও তাঁর স্ত্রী শর্মিষ্ঠার (অসুরদের রাজা বৃষপর্বার দুহিতা) পুত্র । শাপগ্রস্ত যযাতির জরা নিজ-দেহে গ্রহণ করতে অসম্মত হওয়ায় যযাতি অনুকে অভিশাপ দেন যে, অনু নিজেও জরাগ্রস্ত হবেন এবং ওঁর বংশধররাও যৌবনে পা দিতে না দিতেই জরায় আক্রান্ত হবেন। অনুর থেকেই ম্লেচ্ছ জাতির সৃষ্টি হয়।

অনুহ্লাদ

হিরণ্যকশিপুর পুত্র।

অনূপা

কশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী প্রধার কন্যা।

অন্ধ্রদেশ

তামিলনাদের উত্তরাংশ ও অন্ধ্রপ্রদেশের বেশ কিছুটা অংশ।

অপ্সরা

স্বর্গ-বারাঙ্গনা। এঁদের অন্যতমা হলেন উর্বশী, মেনকা, ঘৃতাচী, অলম্বুষা, মিশ্রকেশী্‌, জানপদী, রম্ভা ও বিদ্যুৎপর্ণা। এছাড়া অদ্রিকা, পঞ্চচূড়া, সোমা, মরীচি, শুচিকা, অম্বিকা, ক্ষেমা, অসিতা, সুবাহু, সুপ্রিয়া, সুগন্ধা, সুরসা, বিশ্বাচী, পূর্বচিত্তি, প্রম্লোচা, বর্গা, প্রমথিনী, কাম্যা, শারদ্বতী, গুণবরা, ঋতুস্থলা, বুদ্বুদা, সৌরভেয়ী, ইরা, চিত্রাসেনা, সমীচী, চারুনেত্রা, পুঞ্জিকস্থলা, শুচিস্মিতা, বিশালনয়নার নামও নানা স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। দেবরাজ ইন্দ্র প্রায়ই অপ্সরাদের মর্ত্যে পাঠাতেন মুনি-ঋষিদের প্রলোভিত করে ধ্যান-ভঙ্গ করার জন্য। কারণ ধ্যান সমাপ্ত হলে তাঁরা প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে ওঁর ইন্দ্রত্ব দাবী করে বসতে পারেন!

অবন্তী

মালবদেশ।

অবিজণাতগতি

অষ্টবসুর অন্যতম অনিল ও তাঁর স্ত্রী শিবার পুত্র।

অভিমন্যু

অর্জুন ও তাঁর পত্নী সুভদ্রার (কৃষ্ণের বৈমাত্রেয় ভগিনী) পুত্র । বিরাটরাজের কন্যা উত্তরার স্বামী ও পরীক্ষিতের পিতা। কৃষ্ণের বিশেষ স্নেহভাজন সুদর্শন, বিদ্বান ও সচ্চরিত্র অভিমন্যু বালক বয়স থেকেই অস্ত্রবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী হন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগে ভীষ্ম দুর্যোধনকে বলেছিলেন যে, দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রই মহারথ, কিন্তু অভিমন্যু হচ্ছেন অধিরথ, অর্থাৎ মহারথেরও অধিক। যুদ্ধের তেরো দিনের দিন দ্রোণ চক্রব্যূহের আকারে সেনাসন্নিবেশ করে সেই ব্যূহের মধ্যে কর্ণ, দুঃশাসন কৃপাচার্য, দুর্যোধন, অশ্বত্থামা ও জয়দ্রথকে নিয়ে প্রবল বেগে পাণ্ডবদের সৈন্য সংহার শুরু করলেন। অর্জুন তখন যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যপ্রান্তে সংশপ্তকগণের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত। এই জটিল চক্রব্যূহ ভেদ করতে জানতেন একমাত্র অর্জুন, কৃষ্ণ, প্রদ্যুন্ম আর অভিমন্যু। কিন্তু অভিমন্যু সঙ্কটমুহূর্তে ব্যূহ থেকে নির্গত হওয়ার কৌশলটা জানতেন না। যুধিষ্ঠির ও ভীম অভিমন্যুকে অভয় দিয়ে বললেন যে, অভিমন্যু ব্যূহে প্রবেশ করলেই ওঁরাও অভিমন্যুকে অনুসরণ করবেন। জ্যেষ্ঠতাতদের আশ্বাসে অভিমন্যু চকিতে ব্যূহ ভেদ করে ঢুকলেন। ব্যূহের দ্বার রক্ষা করছিলেন জয়দ্রথ। মহাদেবের বরে সেদিন তিনি ছিলেন অজেয়। তাই ভীম সাত্যকি ইত্যাদি বীররা প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাঁকে অতিক্রম করতে পারলেন না। অভিমন্যু প্রবল বিক্রমে অসংখ্য সৈন্যকে হত্যা করলেন। কৌরবদের সপ্তরথীর প্রত্যেকেই ওঁর ক্ষিপ্রতায় বিপন্ন হলেন। পরে ওঁরা সবাই মিলে একই সঙ্গে রণক্লান্ত অভিমন্যুকে আক্রমণ করলেন। চারিদিক থেকে এইভাবে আক্রান্ত হওয়ায় অভিমন্যুর বর্ম, ধনু ও অন্যান্য অস্ত্রাদি ধবংসপ্রাপ্ত হল। দুঃশাসনপুত্র এই সুযোগে গদা দিয়ে ওঁর সারথি ও অশ্বগুলিকে মারার পর ওঁকেও গদাঘাতে নিহত করলেন। পূর্ব জন্মে অভিমন্যু ছিলেন দেবতা সোমের পুত্র বর্চ্চাঃ। সোমদেব বর্চ্চাঃকে মাত্র ষোল বছরের জন্য মর্ত্যে পাঠাতে রাজি হয়েছিলেন। তাই ষোল বছর পূর্ণ হবার আগেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ওঁর মৃত্যু হল।

অমৃত

দেবভোগ – যা খেলে অমরত্ব পাওয়া যায়।

অম্বা

কাশীরাজের প্রথমা কন্যা, যিনি পরজন্মে শিখণ্ডী হয়ে জন্মে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন। স্বয়ম্বর সভা থেকে ভীষ্ম কাশীরাজের তিন কন্যাকে জোর করে তুলে নিয়ে যান বৈমাত্রেয় ভাই বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিবাহ দেবার জন্য। কিন্তু অম্বা যখন জানালেন যে, তিনি মনে মনে শাল্বরাজকে পতি হিসেবে বরণ করেছেন, তখন ভীষ্ম তাঁকে শাল্বরাজের কাছে পাঠান। শাল্ব ভীষ্মের সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন বলে অম্বাকে প্রত্যাখ্যান করেন। অপমানিত অম্বা তখন তাঁর মাতামহ মহর্ষি হোত্রবাহনের বন্ধু পরশুরামের শরণাপন্ন হন। অম্বার কষ্টে বিচলিত হয়ে পরশুরাম তাঁর শিষ্য ভীষ্মকে বলেন অম্বাকে বিবাহ করতে। ভীষ্ম চিরকুমার থাকার ব্রত নিয়েছিলেন বলে এই আদেশ পালনে অসম্মত হলেন। পরশুরাম তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে ভীষ্মকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন, কিন্তু প্রবল যুদ্ধ করেও তাঁকে পরাজিত করতে পারলেন না। তখন অম্বা নিজেই ভীষ্মকে বধ করবেন ঠিক করে তপস্যা শুরু করলেন। তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব দেখা দিলে, তাঁর কাছে অম্বা ভীষ্ম নিধনের বর চাইলেন। পরজন্মে ওঁর বাসনা পূর্ণ হবে বলে মহাদেব বর দিলেন। তারপর বললেন যে, পরজন্মে অম্বা পাঞ্চাল রাজের কন্যা হয়ে জন্মেও পরে পুরুষত্ব লাভ করবেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শিখণ্ডীর জন্ম-রহস্য জানতেন বলে ভীষ্ম শিখণ্ডীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন নি। শিখণ্ডী নিজে ভালো যোদ্ধা ছিলেন না। তাই শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অর্জুন ভীষ্মকে তীরের পর তীর দিয়ে বিদ্ধ করে শরশয্যায় শুইয়েছিলেন। শিখণ্ডী যুদ্ধের শেষদিন গভীর রাত্রে দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামার হাতে নিহত হন।

অম্বালিকা

কাশীরাজের তৃতীয়া কন্যা ও বিচিত্রবীর্যের পত্নী। বিচিত্রবীর্যের অকাল মৃত্যু হলে, বংশ রক্ষার্থে শ্বাশুড়ি সত্যবতীর ইচ্ছায় সত্যবতীর কানীন পুত্র ব্যাসদেবের সঙ্গে মিলিত হয়ে গর্ভবতী হন। কিন্তু মিলনের সময়ে ব্যাসদেবের কুৎসিত রূপ গন্ধ ও বেশ দেখে অম্বালিকা ভয়ে পাণ্ডুর হয়ে যান। ফলে উনি পাণ্ডুর বর্ণের একটি পুত্রের জন্ম দেন, যার জন্য সেই পুত্রের নাম হয় পাণ্ডু। এই পাণ্ডুই হস্তিনাপুরের রাজা হন। পাণ্ডুর মৃত্যুর পর অম্বালিকা তাঁর ভগিনী অম্বিকা ও শাশুড়ি সত্যবতীর সঙ্গে বনে গিয়ে তপস্যান্তে দেহত্যাগ করেন।

অম্বিকা

কাশীরাজের দ্বিতীয়া কন্যা ও বিচিত্রবীর্যের পত্নী। বিচিত্রবীর্যের অকাল মৃত্যু হলে, বংশ রক্ষার্থে শ্বাশুড়ি সত্যবতীর ইচ্ছায় সত্যবতীর কানীন পুত্র ব্যাসদেবের সঙ্গে

মিলিত হয়ে গর্ভবতী হন। কিন্তু মিলনের সময়ে ব্যাসদেবের কুৎসীত রূপ, গন্ধ ও বেশ সহ্য করতে না পেরে উনি চক্ষু নিমীলিত করে রাখেন। ফলে ওঁর পুত্র ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হয়ে জন্মান। বিচিত্রবীর্যের দ্বিতীয় পুত্র (ব্যাসদেবের ঔরসে অম্বিকার ভগিনী অম্বালিকার গর্ভজাত) পাণ্ডুর মৃত্যুর পর অম্বিকা ও অম্বালিকা শাশুড়ি সত্যবতীর সঙ্গে বনে গিয়ে তপস্যান্তে দেহত্যাগ করেন।

অর্ক

কশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী মুনির পুত্র।

অরণি

দুই কাষ্ঠখণ্ড – পরস্পরকে ঘর্ষণ করে যা থেকে করে আগুন জ্বালানো যায়।

অরিষ্টনেমা

একজন ঋষি। হৈহয় বংশের এক কুমার মৃগয়া করতে এসে মৃগ ভেবে এক ঋষিকুমারকে বধ করেন। হৈহয়রাজগণ নিহত সেই ব্রাহ্মণকে দেখে ব্রহ্মহত্যার ভয়ে ভীত হয়ে তিনি কার পুত্র অনুসন্ধান করতে করতে অরিষ্টনেমার আশ্রমে আসেন। অরিষ্টনেমা তখন তাঁর পুত্রকে ওঁদের দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করেন যে, এই সেই নিহত ব্রাহ্মণ কিনা। ওঁদের বিস্ময় দেখে অরিষ্টনেমা বলেন যে, ওঁরা স্বধর্মের অনুষ্ঠান করেন। অতিথি ও পরিচারকদের ভোজনের পর অবশিষ্ট যা থাকে – তা আহার করেন। ওঁরা ক্ষমাশীল, দানপরায়ণ, শান্ত ও সংযতেন্দ্রিয়। এইসব কারণে ওঁদের মৃত্যুভয় নেই।

অরুণ

কশ্যপ ও বিনতার পুত্র । বিনতার ভগিনী, কশ্যপের অপর পত্নী কদ্রু কশ্যপের কাছে বর প্রার্থনা করেছিলেন যে, ওঁর সম-শক্তিধর এক হাজার নাগ (সাপ) সন্তান হোক। বিনতা সেই শুনে কশ্যপের কাছে বর চান দুটি পুত্রের জন্য, তবে তারা যেন কদ্রুর সন্তানের থেকে বেশি বলশালী হয়। কদ্রুর সন্তান হবার পরও নিজের সন্তান হচ্ছে না বলে বিনতা গর্ভভেদ করে দেখেন যে,একটি সন্তানের উপরের অংশ মাত্র সুগঠিত হয়েছে। সেই পক্ষী সন্তান অরুণ, মায়ের এই অধৈর্য আচরণে বিরক্ত হয়ে মাকে পঞ্চাশ বছর কদ্রুর দাসী হয়ে থাকতে হবে বলে অভিশাপ দিয়ে আকাশে চলে যান সূর্যদেবের সারথি হবার জন্য।

অরুণা

অপ্সরা। কশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী কপিলার কন্যা।

অরুন্ধতী

মহর্ষি কর্দম ও তাঁর স্ত্রী দেবাহূতির কন্যা। বশিষ্ঠ মুনির পতিব্রতা পত্নী।

অর্জুন

পাণ্ডু ও কুন্তীর তৃতীয় পুত্র। দ্রুপদ-রাজের কন্যা কৃষ্ণা (দ্রৌপদী, যিনি পঞ্চপাণ্ডবের সবারই ভার্যা ছিলেন) ছাড়াও অর্জুন আরও তিনজনকে বিবাহ করেছিলেন। এঁরা হলেন – কৌরব্যনাগের কন্যা উলুপী (ইনি পূর্ব-বিবাহিতা ছিলেন), মণিপুররাজ চিত্রবাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদা এবং কৃষ্ণ ভগিনী সুভদ্রা। ওঁর চার পুত্রের নাম শ্রুতকীর্তি (কৃষ্ণার গর্ভজাত), ইরাবান্ (উলুপীর গর্ভজাত), বভ্রুবাহন (চিত্রাঙ্গদার গর্ভজাত) ও অভিমন্যু (সুভদ্রার গর্ভজাত)। কিন্দম মুনির শাপে পাণ্ডুর পক্ষে পিতা হওয়া সম্ভব ছিল না। কুন্তীর কাছে পাণ্ডু যখন জানতে পারলেন যে দুর্বাসা মুনির বরে কুন্তী যে-কোনও দেবতাকে আহ্বান করে তাঁর পুত্র ধারণ করতে পারেন,তিনি কুন্তীকে প্রথমে ধর্ম ও পরে বায়ুদেবকে আহ্বান করতে বললেন। এইভাবেই যুধিষ্ঠির ও ভীমের জন্ম হল। কিন্তু দুই পুত্র লাভ করেও পাণ্ডু তৃপ্ত হলেন না। তখন পাণ্ডুর ইচ্ছায় কুন্তী দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করেন এবং অর্জুনের জন্ম হয়। অর্জুনের জন্মনাম ছিল কৃষ্ণ। শুভ-কর্মে তাঁর রুচি ছিল বলে পরে তিনি অর্জুন নামে পরিচিত হন। অর্জুনের আরও অনেকগুলি নাম ছিল। পৃথার (কুন্তীর জন্মনাম) পুত্র বলে ওঁকে অনেকে পার্থ বলে সম্বোধন করতেন। ওঁর অন্য নামগুলি হল – ধনঞ্জয়, বিজয়, শ্বেতবাহন, ফাল্গুন, কিরীটী, বিভৎসু, সব্যসাচী, জিষ্ণু ও গুড়াকেশ। অর্জুন ছিলেন কৌরব ও পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের প্রিয়তম শিষ্য। গুরুদক্ষিণা স্বরূপ দ্রোণাচার্য যখন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের বন্দিত্ব চান, তখন মূলত অর্জুনের বীরত্বতেই তা সম্ভব হয়। ওঁদের শৌর্যবীর্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্র ও তাঁর পুত্ররা ওঁদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন জেনে পাণ্ডবরা বেশ কিছুদিন ছদ্মবেশে ছিলেন। এই সময় ব্রাহ্মণবেশে অর্জুন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের যজ্ঞবেদিসম্ভূত কন্যা কৃষ্ণার (দ্রৌপদী) স্বয়ংবর সভায় লক্ষ্যভেদ করে তাঁর বরমাল্য পান। পুত্র ঘরে কি এনেছে না দেখে মাতা কুন্তী, সবাই মিলিত ভাবে ভোগ কর, বলায় পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গেই দ্রৌপদীর বিবাহ হয়। দেবর্ষি নারদের উপদেশে পাণ্ডবরা নিয়ম করেছিলেন যে, কৃষ্ণা যে সময়ে এক ভ্রাতার সঙ্গে থাকছেন, সেই সময় অন্য কোনও ভ্রাতা তাঁদের শয়ন-গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন না। করলে তাঁকে বারো বৎসর ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে বনবাস করতে হবে। ঘটনাচক্রে এক ব্রাহ্মণের গোধন রক্ষা করার জন্য অস্ত্র আনতে অর্জুন যুধিষ্ঠির ও কৃষ্ণার শয়ন-গৃহে ঢুকতে বাধ্য হলেন। যুধিষ্ঠির এতে নিয়ম ভঙ্গ হয় নি বললেও, অর্জুন বনবাসে চলে যান। বাস্তবে অবশ্য বনবাস বা ব্রহ্মচর্য – কোনওটাই পরিপূর্ণভাবে তিনি পালন করেন নি। এই সময়কালে একে একে উলুপী, চিত্রাঙ্গদা ও সুভদ্রার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং চিত্রঙ্গদা ও সুভদ্রাকে উনি বিবাহ করেন। উলুপীর আমন্ত্রণে ওঁর সঙ্গে সহবাস করলেও পূর্ব-বিবাহিতা বলে অর্জুন প্রথমে ওঁকে বিবাহ করেন নি। পরে অর্জুন উলুপীকেও ভার্যার সন্মান দেন। অগ্নিদেবের হিতার্থে খাণ্ডব অরণ্য যাতে কৃষ্ণ ও অর্জুন দহনে করতে পারেন, তারজন্য বরুণদেব অর্জুনকে একটি রথ আর সেই সঙ্গে বিখ্যাত গাণ্ডীবধনু ও অক্ষয় তূণ দিয়েছিলেন। এই অস্ত্র পেয়ে অর্জুন বিশেষভাবে বলশালী হন। দ্যূতক্রীড়ায় পরাজিত হয়ে পাণ্ডবরা যখন বনবাস করছিলেন, তখন যুধিষ্ঠিরের আদেশে দিব্যাস্ত্রলাভের জন্য অর্জুন ইন্দ্রলোকে যান। ইন্দ্র তাঁকে মহাদেবের আরাধনা করতে বলেন। তাই করে অর্জুন মহাদেবের কাছ থেকে পাশুপত অস্ত্র পান। এরপর ইন্দ্র নিজেও অর্জুনকে নানাবিধ দিব্যাস্ত্র দেন। ইন্দ্রের নির্দেশে ইন্দ্রসখা চিত্রসেন অর্জুনকে গীত ও নৃত্যে পারদর্শী করেন। সেইখানে নৃত্যরতা অপ্সরাদের মধ্যে উর্বশীর দিকে অর্জুন বারংবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন দেখে, ইন্দ্র উর্বশীকে অর্জুনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। অর্জুন কামনা বসে ওঁর দিকে তাকান নি, উর্বশীকে পুরু বংশের জননী হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু অর্জুন ওঁকে প্রত্যাখ্যান করায় উর্বশী অপমানিত হয়ে অর্জুনকে অভিশাপ দিলেন যে, অর্জুনকে নর্তকরূপে স্ত্রীলোকদের মধ্যে নপুংসক হয়ে থাকবেন। উর্বশীর এই অভিশাপ পাণ্ডবরা যখন বিরাটরাজের সভায় অজ্ঞাতবাস করছিলেন, তখন খুব কাজে লেগেছিল। সেখানে অর্জুন বৃহন্নলা সেজে বিরাটরাজের অন্তঃপুরচারিণীদের নৃত্য, গীত ইত্যাদি শিক্ষা দিয়েছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয়ের অন্যতম কারণ হল অর্জুনের রণনৈপুণ্য। কৌরবদের বহু বীর যুদ্ধকালে ওঁর হস্তে নিহত হয়েছেন। সম্মুখ সমরে ভগদত্ত, জয়দ্রথ, কর্ণকে তিনি বধ করেছেন। কিন্তু ভীষ্মকে শরশয্যায় নিপাতিত করতে তাঁকে শিখণ্ডীকে সামনে রাখতে হয়েছে। এই অন্যায় যুদ্ধের জন্য বসু দেবতাগণ অর্জুনকে নরকবাসের অভিশাপ দিয়েছিলেন। পরে যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় যজ্ঞীয় অশ্বকে নিয়ে বহুদেশ জয় করে যখন মণিপুরে পোঁছলেন, তখন নিজপুত্র বভ্রুবাহনের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অর্জুন এই শাপমুক্ত হন। কৃষ্ণের মৃত্যুর পর অর্জুন তাঁর শক্তি হারাতে শুরু করলেন। একদল গোপালক দস্যুরা যখন যাদববিধবাদের হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁদের রক্ষা করার জন্য বহু চেষ্টা করেও দিব্যাস্ত্রের প্রয়োগ পদ্ধতি অর্জুন স্মরণ করতে পারলেন না। দস্যুরা সফলকাম হল। অর্জুন যখন ব্যাসদেবকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন অর্জুনকে তিনি বললেন দুঃখ না পেতে। অর্জুনদের কাজ শেষ হয়েছে, এখন মহাপ্রস্থানের সময় আসছে। মহাপ্রস্থানের পথে কৃষ্ণা, সহদেব ও নকুলের পরে অর্জুনের পতন হয়। ভীম যুধিষ্ঠিরকে তার কারণ জানতে চাইলে যুধিষ্ঠির বলেন যে, অহঙ্কার ও প্রতিজ্ঞা পালনে অক্ষমতাই অর্জুনের পতনের কারণ। অর্জুনের অহঙ্কার ছিল যে, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। আর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে তিনি বলেছিলেন যে, এক দিনে শত্রুবর্গ নিঃশেষ করবেন – যে কথা অবশ্যই তিনি রাখতে পারেন নি।

অর্জ্জন্য

পকশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী মুনির পুত্র।

অর্থ

সম্পদ। জীবনের একটি আকাঙ্খ বস্তু (বাকি তিনটি হল – ধর্ম, কাম ও মোক্ষ)।

অর্য্যমা

কশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী অদিতির পুত্র।

অলম্বুষ

দুর্যোধনের রাক্ষস বন্ধু যে সাত্যকির তাড়া খেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে বাধ্য হয়।

অলম্বুষা

অপ্সরা; কশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী কপিলার কন্যা।

অশ্ব

দেবতা; একাদশ রুদ্রের একজন রুদ্র।

অশ্বতীর্ণ

কান্যকুব্জের কাছে জাহ্নবীতীরে একটি স্থান যেখানে ঋচীক জলাধিপতি বরুণের বরে বিশেষ রূপ-বিশিষ্ট এক সহস্র অশ্ব লাভ করেছিলেন।

অশ্বমেধ-যজ্ঞ

ঘোড়াকে মানত করে যে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়।

অশ্বত্থামা

দ্রোণ ও কৃপীর একমাত্র পুত্র। জন্মমাত্র ওঁর মুখ থেকে অশ্বের হ্রেষার মত আওয়াজ হয়েছিল বলে ওঁর এই নামকরণ হয়। চিরকুমার অশ্বত্থামা পিতার কাছে ধনুর্বিদ্যা ও বেদশাস্ত্র শিক্ষা করেছিলেন। দিব্যাস্ত্রবিদ ও বীরপুরুষ হওয়া সত্বেও ভীষ্ম ওঁকে মহারথ হিসেবে গণ্য করেছেন, অতিরথ বলে নয়। নিজের প্রাণের প্রতি অত্যধিক মায়া বশত মাঝে মাঝেই প্রাণভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ওঁকে পালাতে দেখা গেছে। কিন্তু যখন তেজের সঙ্গে উনি যুদ্ধ করেছেন তখন তাঁকে অর্জুন-তুল্যই মনে হয়েছে। দ্রোণহত্যার পর অশ্বত্থামার দুর্দম আক্রমণে অসংখ্য পাণ্ডব-সৈন্য নিহত হয়েছে। কিন্তু বহু দিব্যাস্ত্র ব্যবহার করেও তিনি যখন কৃষ্ণার্জুনকে অতিক্রম করে পিতৃহন্তা ধৃষ্টদ্যুম্নকে আঘাত করতে পারলেন না, তখন নিজের অস্ত্রশক্তির বীতশ্রদ্ধ হয়ে রণক্ষেত্র ত্যাগ করেছিলেন। পরে অবশ্য ব্যাসদেবের কাছে জেনেছিলেন যে, পূর্বজন্মের তপস্যার ফলে কৃষ্ণার্জুন অজেয়। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের শেষে ভগ্ন-উরু মৃত্যুপথযাত্রী দুর্যোধনকে দেখে অশ্বত্থামার ক্রোধ আবার প্রজ্জ্বলিত হল। সেই রাত্রে তিনি স্থির করলেন, যেহেতু সম্মুখ সমরে পাণ্ডবদের পরাজিত করা অসম্ভব, নিদ্রিত অবস্থায় তাঁদের হত্যা করতে হবে। তিনি কৃপ ও কৃতবর্মাকে পাণ্ডবশিবিরের বাইরে পাহারায় রেখে নিজে সেখানে প্রবেশ করে প্রথমেই ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করলেন, তারপর একে একে দ্রৌপদীর পুত্রদের ও শিখণ্ডী সহ অন্যান পাঞ্চালদের বধ করলেন। পঞ্চপাণ্ডব সেই শিবিরে ছিলেন না। অশ্বত্থামার এই নারকীয় আচরণের সংবাদ ধৃষ্টদ্যুম্নের এক সারথি কোনও ক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে পাণ্ডবদের দিলেন। পুত্র ও ভ্রাতাদের এই রকম নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে শুনে দ্রৌপদী প্রতিজ্ঞা করলেন, অশ্বত্থামাকে বধ করে তাঁর মাথার সহজাত মণিটি যদি যুধিষ্ঠির ধারণ করেন, শুধু তাহলেই তিনি প্রাণ-বিসর্জন দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। সেই শুনে প্রথমে ভীম ও তাঁর সঙ্গে অন্য পাণ্ডবরা অশ্বত্থামার খোঁজে বার হলেন। অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের দেখে তাঁদের বধ করার উদ্দেশ্যে ব্রহ্মশির নামে এক দিব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। কৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুনও সেই মহাস্ত্রকে প্রতিহত করার জন্য অনুরূপ দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। দুই অস্ত্রের প্রভাবে এক অগ্নি প্রলয়ের সূচনা হল। দেবর্ষি নারদ ও মহর্ষি ব্যাস দুই অস্ত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে দুজনকেই অস্ত্র প্রত্যাহার করতে বললেন। অর্জুন সক্ষম হলেন, কিন্তু অশ্বত্থামা তাঁর অস্ত্র পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে পারলেন না। তিনি তাঁর অস্ত্র উত্তরার গর্ভস্থিত সন্তানের ওপর নিক্ষেপ করলেন। ব্যাসদেবের নির্দেশে নিজের মস্তকের মণিটি অনিচ্ছা সত্বেও পাণ্ডবদের তিনি দিলেন। কৃষ্ণের বরে উত্তরার অস্ত্রদগ্ধ মৃত সন্তান ভুমিষ্ঠ হয়েই পুনর্জীবন পেল, কিন্তু অশ্বত্থামার এই ক্রূর আচরণের জন্য কৃষ্ণ তাঁকে অভিশাপ দিলেন যে, তিন হাজার বছর ধরে সঙ্গহীন অবস্থায় ব্যাধিযুক্ত হয়ে ওঁকে ঘুরে বেড়াতে হবে।

অশ্বিনী

দক্ষের কন্যা ও চন্দ্রের স্ত্রী।

অশ্বিনীকুমার

যমজ দেবতা; সবিতা (সূর্যদেব) ও ত্বাষ্ট্রির যমজ পুত্র; দেব-চিকিৎসক। একবার চ্যবনের রূপবতী পত্নী স্নানরতা সুকন্যাকে দেখে মোহিত হয়ে ওঁরা সুকন্যাকে প্রস্তাব করেন – চ্যবনকে ত্যাগ করে ওঁদের একজনকে বিবাহ করতে। সুকন্যা তাতে সম্মত হন না। ঘটনাচক্রে ওঁদের প্রসাদে চ্যবন তাঁর যৌবন ফিরে পান। চ্যবনের তখন ওঁদের বর দেন যে, দেব-কর্মচারী হলেও ওঁদের সোমপান করবার অধিকার থাকবে।

অশ্মক

কল্মাষপাদের ক্ষেত্রজ পুত্র। কল্মাষপাদের পত্নীর গর্ভে বশিষ্ঠ এঁকে উৎপাদন করেছিলেন। ইনি পৌদন্য রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

অষ্টক

যযাতি-কন্যা মাধবীর কানীন (কন্যা অবস্থায় জাত) পুত্র। এঁর পিতা ছিলেন রাজর্ষি বিশ্বামিত্র। একবার অষ্টক ও তাঁর বৈপিত্র ভ্রাতাদের (শিবি, প্রতর্দন ও বসুমনা) সঙ্গে ভ্রমণ করতে করতে স্বর্গ থেকে ভ্রাতাদের মধ্যে কে আগে নরলোকে ফিরে আসবেন – এই প্রশ্নের উত্তরে দেবর্ষি নারদ বলেছিলেন যে, অষ্টক প্রথমে ফিরবেন। তার কারণ হিসেবে নারদ বলেছিলেন যে, একদিন অষ্টকের সঙ্গে নারদ যখন রথে করে যাচ্ছিলেন তখন নানা বর্ণের সহস্র গরু দেখে অষ্টক নারদকে বলেন যে, তিনিই এইসব গরু দান করেছেন। এই আত্মশ্লাঘার জন্য অষ্টকের প্রথম পতন হবে।

অষ্টবসু

দেবতা; মনু-পুত্র প্রজাপতি ও তাঁর স্ত্রী ধূমা রতা শ্বাসা ও প্রভাতার আট সন্তান – ধর (ভব) ধ্রুব সোম অহঃ (বিষ্ণু) অনিল অনল প্রত্যূষ ও প্রভাস (প্রভব বা দ্যু)। বশিষ্ঠ মুনির কামধেনু সুরভিকে চুরি করতে গেলে মুনি ওঁদের শাপ দেন যে, মর্ত্যে গিয়ে ওঁদের জন্ম নিতে হবে। ওঁরা ক্ষমা চাইবার পর বশিষ্ঠ তাঁর শাপ লাঘব করে বলেন যে শুধু দ্যু – যিনি চুরির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগ নিয়েছিলেন – তিনি ছাড়া আর সবাই এক বছরের মধ্যেই স্বর্গে ফিরে আসতে পারবেন। বসুগণরা তখন দেবী গঙ্গাকে অনুরোধ করেন – মর্ত্যে তাঁদের মাতা হতে। গঙ্গা তাতে রাজি হন, কারণ তিনি জানতেন যে, রাজা মহাভিষ স্বর্গে এসে ওঁকে কামনা করায় ব্রহ্মা স্বর্গবাসের অনুপযুক্ত বলে মহাভিষকে আবার মর্ত্যে পাঠাচ্ছেন। সুতরাং দৈবচক্রে ওঁদের মিলন হবে। মহাভিষ মর্ত্যে এসে মহারাজ প্রতীপের পুত্র শান্তনু নামে জন্ম নেন। শান্তনু রাজা হবার পর একদিন গঙ্গার তীর দিয়ে মৃগয়াতে যাবার পথে দেবী গঙ্গাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করতে চান। গঙ্গাদেবী সম্মতি দেন এই সর্তে যে, শান্তনু কোনওদিন তাঁর কোনও কাজে বাধা দিতে পারবেন না। দিলেই তিনি চলে যাবেন। প্রতি বছর গঙ্গার একটি করে সন্তান হত, আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেটিকে গঙ্গা-নদীতে বিসর্জন দিয়ে বসু দেবতাদের মুক্তি দিতেন। এই ভাবে সাতটি দেবতা মুক্তি পাবার পর যখন অষ্টম সন্তানকে তিনি জলে বিসর্জন দিতে যাচ্ছেন, তখন শান্তনু এসে ওঁকে বাধা দিলেন। গঙ্গাদেবী তখন শর্তের কথাটা শান্তনুকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে নবজাত পুত্রকে নিয়ে অদৃশ্য হন। পরে পুত্র যৌবন প্রাপ্ত হলে গঙ্গা তাঁকে (যিনি পরে ভীষ্ম রূপে পরিচিত) শান্তনুর হাতে দিয়ে বিদায় নেন।

অষ্টাবক্র

উদ্দালক-কন্যা সুজাতা ও উদ্দালক-শিষ্য কাহোড়ের পুত্র। অষ্টাবক্র মাতৃগর্ভেই বেদজ্ঞান লাভ করেছিলেন। একদিন বেদপাঠরত কাহোড়কে তিনি মাতৃগর্ভ থেকেই বলেন যে, কহোড়ের বেদপাঠ ঠিক হচ্ছে না। মহর্ষি কাহোড় তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে গর্ভস্থ পুত্রকে শাপ দিলেন যে, তার দেহ অষ্টস্থানে বক্র হবে। অষ্টাবক্র তখনও ভূমিষ্ঠ হন নি ওঁর পিতা অর্থোপার্জনের আশায় জনক রাজার কাছে যান। সেখানে বন্দী নামে এক পণ্ডিত থাকতেন, যাঁর সঙ্গে তর্কে পরাস্ত হলে রাজ আজ্ঞায় পরাজিতদের জলে ডুবিয়ে দেওয়া হত। কাহোড় তর্কে বন্দীর কাছে পরাস্ত হওয়ায় তাঁরও সেই গতি হল। অষ্টাবক্র শিশু অবস্থায় জানতেন না যে, তাঁর পিতার মৃত্যু হয়েছে – তিনি উদ্দালককেই পিতা বলে জানতেন। বালক বয়সে তিনি যখন মাতা সুজাতার কাছে পিতার মৃত্যুর কারণ জানতে পারলেন,তখন তিনি মাতুল শ্বেতকেতুকে নিয়ে জনক রাজার কাছে গেলেন। সেখানে বন্দীকে তর্কে পরাস্ত করে তিনি বললেন যে, বন্দী যেরকম পরাজিত ব্রাহ্মণদের জলে ডুবিয়েছিলেন, এবার সেই ভাবে বন্দীকে জলে ডোবানো হোক। বন্দী তখন নিজেকে বরুণের পুত্র বলে পরিচয় দিয়ে বললেন যে, তিনি ব্রাহ্মণদের জলের মধ্যে পিতা বরুণের যজ্ঞ দেখতে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা এখন সবাই ফিরে আসবেন। তবে উনি অষ্টাবক্রের সন্মানে জলের মধ্যে অন্তর্ধান করে পিতার সঙ্গে মিলিত হবেন। কাহোড় ও অন্যান্য ব্রাহ্মণরা ফিরে এলে বন্দী সমুদ্রে প্রবেশ করলেন। কাহোড় পুত্র গর্বে পরম প্রীত হয়ে অষ্টাবক্রকে একটি নদীতে প্রবেশ করতে বললেন। সেই নদী থেকে উঠতেই অষ্টাবক্রের দেহ আর বক্র রইলো না। বদান্য ঋষির কন্যাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে অষ্টাবক্র তাঁকে বিবাহ করতে চাইলে, বদান্য অষ্টাবক্রকে বললেন যে, উত্তর দিকে যাত্রা করে কুবের-ভবন অতিক্রম করে এক রমণীয় বনে পৌঁছে – সেখানে এক তপস্বিনীর সঙ্গে দেখা করে ফিরে এলে তারপর উনি ওঁর কন্যাকে দান করবেন। অষ্টাবক্র বহু পথ অতিক্রম করে সেই বনে পৌঁছে এক দিব্য আশ্রমের কাঞ্চনময় ভবনে প্রবেশ করলেন। সেই ভবনে কয়েকটি সুন্দরী নারীর সঙ্গে এক বৃদ্ধা রমণী ছিলেন। সেইখানে থাকাকালীন সেই বৃদ্ধা অষ্টাবক্রের শয্যায় এসে ওঁর সঙ্গে মিলিত হবার চেষ্টা করতেন। অষ্টাবক্রকে লোভ দেখাতেন যে, ওঁর কামনা পূর্ণ করলে ওঁর রমণীয় আশ্রম সমেত সব ধন অষ্টাবক্রের হবে। অষ্টাবক্রের কাছে প্রত্যাখ্যাতা হবার পর এক রাত্রে তিনি পরম রূপবতী কন্যায় রূপান্তরিত হয়ে অষ্টাবক্রকে প্রলোভিত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অষ্টাবক্র প্রলোভিত হলেন না। তখন সেই বৃদ্ধা নিজেকে উত্তরদিকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে পরিচয় দিয়ে বললেন যে, তিনি বদান্যের অনুরোধে অষ্টাবক্রকে পরীক্ষা করছিলেন। আরও বললেন যে, অষ্টাবক্র যেন মনে রাখেন যে, স্ত্রী জাতি চপলা এবং স্থবিরা স্ত্রীরও কামজ্বর হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অষ্টাবক্র ফিরে এসে বদান্য-কন্যা সুপ্রভাকে বিবাহ করেন।

অসুরা

কশ্যপ ও প্রধার কন্যা।

অহঃ

অষ্টবসু দেবতার একজন। প্রজাপতি ও তাঁর স্ত্রী রতার পুত্র।

অহির্বুধন্য

দেবতা; একাদশ রুদ্রের একজন রুদ্র।

সুজন দাশগুপ্ত

Hits: 239