আমার বন্ধু শামীম

আমার বন্ধু শামীম

কলেজে পড়ার সময় আমার এক বন্ধু ছিল শামীম। পুরো নাম মহম্মদ শামীম আলম। শামীম উত্তরপ্রদেশের আলীগড় থেকে পড়তে এসেছিল। ছেলেটি ছিল গোঁড়া মুসলমান, উর্দু ভাষার ছাত্র, পড়াশুনার পাশাপাশি আইসা নামে একটি অতিবাম ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সহজভাবে ভাবলে আমার সঙ্গে ওর কোন বন্ধুত্ব না হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও কিছু কারণবশত ওর সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সেমিস্টারের শেষে যখন বাড়ি যেতাম তখন আমার ট্রেন নীলাচল এক্সপ্রেস ভোর চারটের সময় স্টেশন থেকে ছাড়ত। আমি রাত তিনটার সময় হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পুরো এক কিলোমিটার হেঁটে ইউনিভার্সিটির গেটের বাইরে বেরিয়ে অটো ধরে রেলস্টেশন যেতাম। সে রাতে আর ঘুমানো হতো না, আমি আর শামীম রাত জেগে হোস্টেলের টিভি রুমে বসে বসে গল্প করতাম। আমার যে ব্রাহ্মণ রুমমেট ছিল ঘোর হিন্দুত্ববাদী, যে প্রায়ই নানা বিষয়ে লেকচার ঝাড়ত, সে ঠিক সময়ে ঘুমিয়ে যেত, কিন্তু শামীম ঘুমোত না। আমার সঙ্গে সঙ্গে সারা রাত জেগে গল্প করত, তারপর সময় হলে জিনিসপত্র গুছিয়ে আমরা দুজনে ট্রলি ব্যাগটিকে টেনে টেনে উনিভার্সিটি গেট পর্যন্ত যেতাম। আমাকে অটোতে তুলে দিয়ে শামীম তার হোস্টেলে ফিরে যেত।

শামীমরা ছিল অভিজাত সুন্নি সৈয়দ মুসলমান। ওর কোন একটা আত্মীয় আলীগড়ের একটা বড় মসজিদের ইমাম ছিল। সে যাই হোক। একদিন আমরা হোস্টেলে বসে বসে গল্প করছি, হঠাৎ করে শামীমের ফোনে একটা কল এল। শামীম ফোন তুলে হ্যালো বলে কথা বলতে থাকল। দুমিনিট কথা শুনেই আমি বুঝলাম যে কোন একটি মেয়ে ফোন করেছে, আর শামীম তার সাথে ফ্লার্ট করছে। কিছুক্ষন পর ভাটের বকা বন্ধ হলে মেয়েটির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় শামীম বলল, “আর বলিস না। আফসানা বলে একটি মেয়ে আছে। মুনিরকায় ভাড়া থাকে। চাকরি করে। আমি টাইম পাস করি। দেখতে কিন্তু হেভি আছে।”

আমি বললাম, “দেখতে হেভি আছে, তোর পেছনে লেগে আছে, চাকরি করে, তো বিয়ে করে নে। সব সুযোগ সবসময় পাবি কি?”

এই শুনে শামীম বলল, “না ভাই। বিয়ে তো আমি কোন হিন্দু মেয়েকেই করব।”

আমি শুনে একটু চুপ করে গেলাম। তারপর বললাম, “ঠিক আছে। তোর মর্জি।”

শামীম তখন আমাকে বোঝাতে শুরু করল, “দ্যাখ ভাই। পড়াশুনার পাশাপাশি আমি পলিটিক্সটাও তো করি। আলীগড়ে আমাদের পরিবারের বেশ জানাশুনাও আছে। কোন পার্টি জয়েন করে যদি কিছু পদ পেয়ে যাই, কোন হিন্দু মেয়েকে তো সহজেই বিয়ে করতে পারব, তাই না?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ নিশ্চয়ই। লেগে থাক।”

তখন শামীম বলল, “তবে তুই একটা কাজ করতে পারিস। তুই আফসানাকে পটিয়ে ফেল। আমি হেল্প করব। খাসা মাল আছে ভাই।”

শামীমের দৌলতে আফসানার সঙ্গে দেখাও হয়েছিল। খাসা মেয়েই বটে। এই মেয়েটিও সৈয়দ। দেখা হওয়ায় কোন লাভ হয়েছিল কিনা সেই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। একদিন শামীমকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “আফসানার সাথে প্রেম করে আমার কি হবে? আমি তো হিন্দু।”

শামীম বলল, “তাতে কি আছে? তুই মুসলমান হয়ে গেলেই হবে। সামান্য ব্যাপার।”

আমি বললাম, “কিন্তু তাতে কি? আফসানারা সৈয়দ। আমি নিচু জাতের হিন্দু। মুসলমান হয়েই বা কি হবে? আমি কি সৈয়দ হতে পারব?”

শামীম অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “তুই এখনো আমাদের সমাজকে চিনিস না। যারা অন্য ধর্ম থেকে স্বেচ্ছায় আমাদের ধর্মে আসে, তাদের আমরা খুব উঁচুতে স্থান দিই। তুই নিশ্চয়ই সৈয়দ হবি। তুমি এত পড়ালিখা করা ছেলে, এত সৎ ও সাহসী, তোর মধ্যে সৈয়দ হওয়ার সব গুন আছে। তোরাই তো ভবিষ্যতে ইসলামকে এগিয়ে নিয়ে যাবি। আমাদের পরিবারও সৈয়দ। তোকে আমাদের সমাজের একজন করার সব দায়িত্ব আমি নেব।”

এত দিন পরেও শামীমের সেই কথাগুলো হুবহু মনে পড়ে। আফসানার সঙ্গে প্রেম হয়নি, আমারও সৈয়দ হওয়া হয়নি। শামীমের সঙ্গেও আর যোগাযোগ নেই। তবে শামীমকে এখনো আমি বন্ধুর চোখেই দেখি। শামীম ভুল না ঠিক সেই প্রসঙ্গ এখানে আপাতত অপ্রয়োজনীয়। কারণ শামীম অসৎ কিছু করতে চেয়েছিল বলে আমার কোনদিন মনে হয়নি। সে তার নিজ বিশ্বাস অনুসারে বন্ধুকে তার ধর্ম ও সমাজে প্রবেশ করাতে চেয়েছিল। যথেস্ট সম্মানের সাথেই চেয়েছিল। এটাই তো স্বাভাবিক। শামীম চাইত তার ধর্মের বিস্তার ঘটুক। বিস্তারই ধর্মের জীবনকাঠি। যে ধর্ম ও সমাজ নিজেকে বিস্তার করতে পারে, তারাই পৃথিবীতে এগিয়ে যায়। যারা পারে না, তারা বিলীন হয়ে যায়।

আফসানা ছাড়া আরও একটি মুসলিম মেয়ের কথা এখানে অল্প বলার আছে। এর নাম আকসা। আকসা আর আফরিন ছিল দুই বোন। এরা ছিল লখনৌয়ের অভিজাত শিয়া পরিবারের মেয়ে। আকসা মধ্যযুগের ইতিহাসের ছাত্রী ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে কি একটা বিষয় নিয়ে রিসার্চ করত মনে নেই। দুই বোনই ছিল কথায় বার্তায়, চলনে বলনে খুব আধুনিক, জিন্স আর টপ ছাড়া অন্য কিছু পরত না। আফরিনের সাথে আমার সেরকম পরিচয় ছিল না। মেয়েটিও ছিল খুব মুডি আর গম্ভীর ধরনের। আকসা ছিল ওর ছোট বোন। এ ছিল দিদির উল্টো, খুব হাসিখুশি, সহজ সরল। আকসার সাথে কিভাবে যোগাযোগ হয়েছিল অত কথা বলা যাবে না। চা খেতে খেতে গল্প করার সময় আকসা আমাকে প্রায়ই মুঘল যুগে ভারত কত উন্নত ছিল, মুঘল শাসকরা কত উদার ছিলেন ও সেসময় নারী স্বাধীনতা কতটা বেশি ছিল এসব বোঝানোর চেষ্টা করত। এর পাশাপাশি লখনৌয়ে ওদের পরিবার, খাবারদাবার ও জীবনযাত্রা ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা হত। একদিন এই রকমই এক চায়ের আড্ডায় আমি আকসাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আকসা, তোমার তো ‘ইসলামে নারীর অবস্থান’ নিয়ে লেখাপত্র আছে। আমি কদিন আগে ইন্টারনেটে একটি প্রবন্ধ পড়ছিলাম। পড়ে খুবই আশ্চর্য হয়েছি। সেখানে লেখা আছে যে নবী হজরত মহম্মদ বিভিন্ন যুদ্ধজয়ের পর অনেক যৌনদাসী রাখতেন। এমনটি উনি তিপান্ন বছর বয়সে মাত্র ছয় বছর বয়সী হজরত আয়েশাকে বিয়ে করেন। এই তথ্যগুলোর সত্যমিথ্যা নিয়ে তোমার কাছে জানতে চাইছি। তোমার কি মত?”

আকসা তো শুনে রেগে আগুন। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ গুছিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যায় আর কি। অনেক কষ্টে ওকে চেপেচুপে আবার বসালাম। কিছুক্ষন পর একটু ঠান্ডা হয়ে আকসা বলল, “দেবব্রত, তোমাকে এতদিন দেখছি, তোমার কাছ থেকে এরকম কথাবার্তা তো আশা করিনি। এসব কথা তো বলে যারা একদম অশিক্ষিত, কোনদিন কিচ্ছু পড়াশুনা করেনি তারাই। তুমি শিক্ষিত ছেলে হয়েও এসব বলবে? ছি ছি, তাহলে তোমার সঙ্গে ওদের তফাৎ কি রইল?”

আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, “সরি, ভুল হয়ে গেছে। ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্য, ওগুলোর কি সত্যি মিথ্যা বোঝার উপায় আছে?”

এই শুনে আকসার মন ঠান্ডা হল। আমাকে একটু করুনার দৃষ্টিতে দেখে ইসলামের বিভিন্ন গুণাবলী বোঝাতে শুরু করল।

কতদিন কেটে গেছে, কিন্তু আকসার সঙ্গে সেই কথাবার্তাগুলো ভুলিনি। আকসা এখন কোথায় আছে জানি না, তবে আমি শামীমের মত আকসাকেও উন্নত ও বুদ্ধিমান মানুষ বলেই মনে করি। আকসা সুন্দরী ছিল, স্মার্ট ছিল, শিক্ষিতা ছিল, অভিজাত পরিবারের মেয়ে ছিল, আধুনিকা নারীর সব গুনই ওর মধ্যে ছিল। তবুও নিজ ধর্ম, প্রথা, পরম্পরা ও সমাজের বিষয়ে আকসা যথেষ্ঠ গর্বিত ও রক্ষণশীল ছিল। নারী চরিত্র তো এমনিই হওয়া উচিত।

এরকম অভিজ্ঞতা অনেক আছে। যাই হোক, আকসাদের মত মেয়ের সাথে হিন্দু উচ্চবর্ণের তথাকথিত আধুনিক মেয়েদের পার্থক্য যে কি তা ব্যাখ্যা করা খুব সময়সাপেক্ষ নয়। একটা ঘটনা বলছি। দিল্লিতে সিরি ফোর্ট নামে একটি জায়গা আছে। এটি কলকাতার নন্দনের মত একটি জায়গা, এখানে নানা বিদেশী আর্ট ফিল্মের প্রদর্শনী হয়। এখানে একবার ‘ইস্ট এশিয়ান’ সিনেমার প্রদর্শনী হচ্ছিল। আমি দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন একটা কোরিয়ান সিনেমা ছিল। আমি যখন পৌঁছাই তখনও সিনেমা শুরু হতে অনেক বাকি। সিনেমা হাউসের লনে ও কফি হাউসে অনেক অভিজাত বুদ্ধিজীবী লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্প করছিল। কোন এক চ্যানেলের একটি মেয়ে সাংবাদিক তার ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে যাকে তাকে নানা প্রশ্ন করছিল। হটাৎ মেয়েটির চোখে পড়ল একজোড়া যুবক যুবতী এক কোনে বসে আছে। ছেলে মেয়ে দুটির কথাবার্তা, সাজসজ্জা আর পোশাক আশাক দেখেই বোঝা যায় যে এরা অত্যন্ত ধনী ও অভিজাত পরিবার থেকে আসা। সাংবাদিক মেয়েটি ওই দুটি ছেলেমেয়ের কাছে এসে ওদের ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু করল। ছেলেটি একটু গম্ভীর ছিল, কিন্তু মেয়েটি বেজায় খুশি হয়ে গেল। হেসে হেসে নানা স্মার্ট অঙ্গভঙ্গি করে মেয়েটি গদগদ হয়ে ইন্টারভিউ দিচ্ছিল। কথায় কথায় মেয়েটি চপল ভঙ্গিতে ইয়ার্কি মেরে বলল যে সে বাঙালী, তাই আর্ট ফিল্ম ব্যাপারটা সে তার “বেরসিক” বয়ফ্রেণ্ডের চেয়ে বেশি বোঝে। এই শুনে ছেলেটা একটু মুচকি হাসল। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শেষ করে যখন ওদের নাম জিজ্ঞাসা করা হল, তখন মেয়েটি বলল যে ওর নাম সুর্যানী মুখার্জী। ছেলেটার নাম জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, ওর নাম শাহনওয়াজ খান।

গল্পটা শুনে কিছু বোঝা গেল কি?

একবার অন্বেষা মুখার্জী বলে একটি বাঙালী মেয়ের সঙ্গে একটু আলাপ হয়েছিল। মেয়েটি দিল্লির লেডি শ্রীরাম কলেজের ছাত্রী ছিল। দেখতে শুনতে বেশ স্মার্ট আর বড়লোকের মেয়ে। সাম্যবাদ, উদারতা, নারীবাদ ইত্যাদি বিষয়ে প্রায়ই লেকচার দিত। আমি রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থী বলে আমি যে একটি সঙ্কীর্ণমনা বর্বর তাও আকারে ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করত। আমি ওর বোলচাল শুনে আশ্চর্য হয়ে যেতাম। এই যে মুখার্জী ব্রাহ্মণ, যারা আজ থেকে একশ বছর আগেও কোন কাজবাজ না করে স্রেফ লোকের জাত মেরে বেড়াত, তাদেরই মেয়ে একশ বছর পরে আমাকে শেখাবে “সাম্যবাদ”? যে ব্রাহ্মণরা একশ বছর আগেও কুলীন প্রথার নামে ষাট বছর বয়সেও পঞ্চাশটা করে কচি মেয়েকে বিয়ে করত আর বুড়োগুলো মারা গেলে তাদের আত্মীয়রা সেই কচি বিধবা মেয়েগুলিকে সাদা শাড়ি পরিয়ে কাশীতে ভিক্ষা করার জন্য পাঠিয়ে দিত, সেই ব্রাহ্মণের মেয়ে আজ একশ বছর পরে আমাকে শেখাবে কিছু বিদেশী বই থেকে ধার করা “নারীবাদ”?

দুদিন টিভিতে ‘সেক্স এন্ড দ্যা সিটি’ সিরিয়াল দেখে নিজেকে জেসিকা পার্কার ভেবে ভাঁড়গিরি করা ওইসব উচ্চবর্ণের বাঙালী মেয়েদের নিয়ে কথা বেশি বলার প্রয়োজন দেখি না। শুধু একটা কথাই বলার আছে যে এদের সাথে আকসা, আফরিন বা আফসানার মত মেয়েদের কোন তুলনাই হয় না।

এক উদ্ভ্রান্ত, ব্যক্তিত্বহীন, ভীরু, অপরিণামদর্শী সমাজের মুখে যে কোন আদর্শ, সে সাম্যবাদই হোক বা ব্রাহ্মণ‍্যবাদ, নারীবাদ হোক বা অবগুণ্ঠনবাদ, উদারতা হোক বা রক্ষণশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা হোক বা হিন্দুত্ববাদ, নাস্তিকতার সবজান্তাগিরি হোক বা আস্তিকতার দেখনদারি, সব কিছুই হাস্যকর। তাই তথাকথিত স্বাধীনোত্তর ভারতে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের যাবতীয় রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ড, সে সিপিএম হোক বা আর এস এস, পুরোটাই সস্তা ভাঁড়ামি। এতে চিৎকার আর স্লোগানবাজি অনেক আছে, তবে কাপুরুষের নিরাপদ দূরত্বের চিৎকারে দেশ বা সমাজের আদৌ কোন প্রকৃত সাফল্য আসেনি।

এই নিয়ে আরো অনেক কথাই বলার আছে। ধীরে ধীরে সেসব বলা যাবে।

দেবব্রত মণ্ডল

Hits: 155